23/10/2024
| বাঙালি ব্যবসা করো, পকেট ভারী করো |
---- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ
ছেলে কী করে? বিজনেস। বিজনেস? কিসের বিজনেস? যে উত্তর দিচ্ছে সে এবার ইতস্তত বোধ করছে ভেঙে বলতে। যে শুনছে, তার চোখে ছেলে ইতিমধ্যে সামাজিক স্তরের শেষ ধাপে নেমে গেছে। বিজনেস ম্যান! মানেই নির্ঘাত এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ নম্বরি। সেই কবে রায় বাবু শিখিয়েছে। রায় বাবু তো জন-অরণ্যে বাঙালিকে ব্যবসা করাও শিখিয়েছে। সেটা শিখলাম কই! যাক গে, প্রশ্ন কর্তার তবুও কৌতূহল। ছেলে বিজনেস করে, যদি হর্ষ নেওটিয়া, সঞ্জীব গোয়েনকা নাম টাম ভুলে উচ্চারিত হয়। ছেলে কাপড়ের ব্যবসা করে। ফের প্রশ্ন, ইউ মিন apparels? হাতিবাগানে শায়া - ব্লাউসের হোলসেলার! মহাকাশের সবচেয়ে প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা যেন। হাতিবাগান? শায়া - ব্লাউসের ব্যবসা? ২৫ বছরের এক যুবক আর তার মা - বাবার আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন শুরুতেই পায়ে পিষে মেরে দিলাম আমাদের শ্লেষ, আমাদের অহং, উন্নাসিকতা আণবিক বোমায়। এরপরও বাঙালি ব্যবসা করবে? ধ্যাৎ! বাঙালি লাক্স কোজি বিজ্ঞাপনে সৌরভ গাঙ্গুলিকে দেখবে।
করবে যদি উত্তরটা হত, বাবার ব্যবসা দেখছি। নাক উঁচু হলেও, করবে যদি বলে, মদের দোকান বা বার আছে। করবে যদি প্রোমোটারি লাইনে হাত পাকিয়ে ফেলে। ছেলে মোমোর চেন খুলেছে, ছেলে হোসিয়ারি ব্যবসা করে, ছেলে বাথরুম পরিস্কার করার, অফিসে অফিসে ক্যান্টিন চালানোর ব্যবসা করে? মায়ের স্ট্রোক হয়ে যেতে পারে। বাবা থম মেরে যেতে পারে। প্রথম চিন্তাই হল, ব্যবসা ডুবলে? এই চিন্তা প্রথমেই আসে না, গাড়ি কেনার পরে। যদি এক্সিডেন্ট করে? তখন ভুলেও কেউ বললেই অনামুখো, অপয়া ইত্যাদি বলে, বালাই ষাট বলতে হয়। বাঙালি এমনই। প্রথম রাতে বেড়াল মারে। প্রথম অবস্থাতেই ব্যবসার মনোবল ভাঙ্গে।
লক্ষ্মী দেবী নিজেও বোধহয় এতদিনে বুঝে গেছেন বাঙালির ফান্ডাটা। এখানে দাবি দাওয়া যথেষ্ট কম। বাঙালি বেশিরভাগটাই প্রার্থনার ফর্দতে রাখে, মা গো, DAটা এবার দিয়ে দিক। মাগো, ফিক্সড ডিপোজিট ওমুক ব্যাংকে আছে মা, ডুবে না যায়। রক্ষা করো। ইএমআই চলছে মা গো। অত্যাধুনিক দরজা ঠেলে, এসো মা লক্ষ্মী বসো ঘরে। খিচুড়ি খাও, লাবড়া খাও, কাল সকালে অফিস যাও। বাঙালি ব্যবসা করুক, ব্যবসা করুক বললেই ব্যবসা হয় না। তার জন্য জল হওয়া লাগে। ছায়া লাগে। প্রয়োজনে সার লাগে। মাচা লাগে। বাঙালি কবে মারোয়ারি ব্যবসায়ীদের মত নিজের আত্মীয়কে টেনে তুলবে? ব্যবসায় প্রাথমিক মূলধন যোগাবে? টেন্ডার পাইয়ে দেবে? বাঙালি আবার এসব করলে, গড্ডালিকাপ্রবাহে বয়। ছোটবেলা থেকে বাঙালিকে শেখানো হয়, বাবু কাউকে কিচ্ছু বলবে না, পরীক্ষার হলে দেখাবে না। তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা করেছো। তোমার বাবা দিন রাত এক করে তোমার জন্য কাজ করছে! অন্য কেউ এগিয়ে গেলে পাড়ায় মুখ দেখাবো কিভাবে? ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার না হলে পাড়ায় মাথা উচুঁ করে চলবো কিভাবে?
বাংলায় শিল্প গুপী বাঘা তালি দিলেই আর আসবেনা। তার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে লবি করতে হবে। অবশ্য লবি, মিডিল ম্যান, ধান্দা এসব শব্দেও তো বাঙালির ঘোরতর আপত্তি। বাঙালির অভিধানে ব্যবসা মানে নিচু ব্যাপার। তাই কোটি টাকা দিনে হাত বদল করে যে ময়লা কাপড় পরা ব্যবসায়ী তাকে ৫০ হাজারি চাকুরে খাটো চোখে দেখার সাহস পায়।
বাঙালি এক আজব জাতি, এরা টাকা খরচ করে ভুয়ো চাকরি কিনতে পারে, প্রায় কোটি টাকার ক্যাপিটেশন ফি দিয়ে ডাক্তারির সিট কিনতে পারে, ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি পাবে না জেনেও ইঞ্জিয়ারিং কলেজে ভর্তি হতে পরে, কিন্তু সেই টাকা মূলধন হিসেবে ব্যবহার করে ব্যবসা করতে পারে না। ওই যে, শ্যাওড়া গাছের কিছু জ্যাঠা বসে আছেন ভয় দেখানোর জন্য। ব্যবসা ডুবলে? আর ডুবলে আবার উঠবে! ফিনিক্সের মত উড়বে! শুরু তো হোক!
এটা তো ঠিক যে KFC আদপে তেলেভাজাই। আর মাল্টি ন্যাশনাল ভুজিয়া বিক্রেতা আসলে চানাচুরওয়ালাই। বাংলায় এদের জন্য চাই উদ্বুদ্ধ করা, ব্যাপক পিঠ চাপড়ানো, ছোট শিল্পের প্রতি বড় অভিভাবকত্ব। কিন্তু বাংলায় মুসকিলটা অন্য জায়গায়। মুশকিলটা মেনস্ট্রিম আর প্রান্তিকতার। চাইলেও চটের ব্যাগ প্লাস্টিকের ক্যারি ব্যাগের বাজার দখল করতে পারবে না। এটা সম্ভব না। শুভাপ্রসন্নের শিল্প আর আইটিসির শিল্প উদ্যোগ দুটো আলাদা। ভাত আর বিরিয়ানের মধ্যে তফাৎ করতে শিখুন। প্রথমটা কাশফুলের বালিশের মত লক্সারি, পরেরটা জাজিমের মত নেসেসিটি। টাটা সিঙ্গুর থেকে গিয়ে ভুল হয়েছে। আর মোটেও গুজরাটে ন্যানো কারখানা বন্ধ হয়নি। কিছু লোক মিথ্যাচার করবে রাজনীতির জন্য। কিন্তু বাঙালি ঠিক করুক, নবজাগরণটা এবার লক্ষ্মীর আশীর্বাদধন্য হয়ে প্যাঁচায় চেপে আনবে কিনা। হাতে অর্থ থাকলে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাও থাকবে। কোজাগরী পূর্ণিমাতে এটাই হোক বাঙালির শপথ। বাঙালি ব্যবসা করবে।
©----- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ
Art: Sreetama Mohar Das