21/06/2026
#নিষিদ্ধ_রাতের_পবিত্রতা
Rakib Ahmed
# # # **৪র্থ পর্ব: ভাগ্যের চাকা ও হাসপাতালের সাক্ষাৎ**
বাগানবাড়ির সেই রাতের পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। মাহবুব নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নিয়েছে। মেঘলার সেই নোংরা প্রতারণা আর বিষাক্ত অধ্যায়টি সে নিজের জীবন থেকে চিরতরে মুছে ফেলেছে। এখন তার পুরো মনোযোগ বাবার বিশাল ব্যবসা 'আহমেদ গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ'-এর ওপর। কিছুদিন পরেই সে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিরেক্টরের চেয়ারে বসবে।
মাহবুবের পরিবারে এখন আনন্দের হাওয়া। বিশেষ করে তার একমাত্র ছোট বোন সিনথিয়া, যে এই বছর কলেজে উঠেছে, তাকে নিয়ে পুরো পরিবার মেতে থাকে। মাহবুব তার এই আদরের বোনটিকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।
সেদিন দুপুরবেলা। আকাশটা সকাল থেকেই কিছুটা মেঘলা ছিল। সিনথিয়া কলেজ শেষ করে হেঁটে রাস্তার ওপাড়ে থাকা নিজের গাড়ির দিকে যাচ্ছিল। কানে হেডফোন গোঁজা থাকায় সে খেয়ালই করেনি যে পেছন থেকে একটা বেপরোয়া গতির রিকশা তীব্র বেগে তার দিকেই ধেয়ে আসছে। রিকশাচালক চিৎকার করে ব্রেক চাপার চেষ্টা করলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
"এই মেয়ে, সরো! সামনে থেকে সরো!" চারপাশের মানুষের চিৎকারে সিনথিয়া চমকে তাকাল, কিন্তু ভয়ে সে রাস্তার মাঝখানেই জমে গেল। রিকশাটি যখন তার থেকে মাত্র ইঞ্চিখানেক দূরে, ঠিক তখনই এক বোরকা পরা তরুণী চিতাবাঘের মতো ছুটে এসে সিনথিয়াকে জড়িয়ে ধরে রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ল।
রিকশাটি তাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেল। সিনথিয়া পিচঢালা রাস্তায় পড়ার কারণে হাত-পায়ে সামান্য চোট পেলেও এক বড়সড় নিশ্চিত দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে গেল। কিন্তু যে মেয়েটি তাকে বাঁচাল, তার কনুই কেটে রক্ত বের হতে শুরু করেছে। মেয়েটি নিজের ব্যথার তোয়াক্কা না করে দ্রুত সিনথিয়াকে টেনে তুলল এবং ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, "তুমি ঠিক আছ তো বোন? কোথাও বেশি লেগেছে?"
সিনথিয়া কাঁপতে কাঁপতে বলল, "আ... আমি ঠিক আছি। কিন্তু আপনার হাত থেকে তো রক্ত পড়ছে!"
মেয়েটি নিজের ওড়না দিয়ে রক্তটা চেপে ধরে বলল, "ও কিছু না। চলো, আগে তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।"
মেয়েটি কোনো ঝুঁকি না নিয়ে সিনথিয়াকে নিয়ে কাছের একটি বড় হাসপাতালে চলে এলো। জরুরি বিভাগে সিনথিয়ার প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে মেয়েটি তাকে একটি কেবিনে বসাল। তারপর সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, "তোমার বাসায় একটা ফোন দেওয়া দরকার। তোমার আম্মু বা আব্বুর নম্বরটা দাও, আমি কথা বলছি।"
সিনথিয়া ব্যাগ থেকে তার ফোনটা বের করতে গিয়ে দেখল স্ক্রিনটা ভেঙে বন্ধ হয়ে গেছে। সে ভয়ার্ত গলায় বলল, "আমার ফোনটা তো নষ্ট হয়ে গেছে। আপনি প্লিজ আমার ভাইয়ের নম্বরে একটা কল দিন।" এই বলে সে মাহবুবের নম্বরটি মুখস্থ বলল।
মেয়েটি নিজের পুরনো বাটন ফোন থেকে সেই নম্বরে ডায়াল করল।
এদিকে অফিসে বসে একটি জরুরি ফাইল দেখছিল মাহবুব। হঠাৎ একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসতেই সে রিসিভ করল, "হ্যালো, কে বলছেন?"
ওপাশ থেকে এক নারীর কাঁপা অথচ চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "হ্যালো, আপনি কি সিনথিয়ার ভাই মাহবুব সাহেব বলছেন? সিনথিয়া রাস্তায় একটা ছোটখাটো এক্সিডেন্ট করেছিল। আমি তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। তবে ভয়ের কিছু নেই, ও এখন সুস্থ আছে।"
"কী!"
বোনের এক্সিডেন্টের কথা শুনে মাহবুবের হাতের কলমটা মেঝেতে পড়ে গেল। তার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। সে আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করল না। বসের চেয়ার ছেড়ে সে পাগলের মতো লিফটের দিকে ছুটল। গাড়ি নিয়ে তীব্র গতিতে হর্ন বাজাতে বাজাতে সে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। তার পুরো শরীর তখন উদ্বেগে কাঁপছিল।
হাসপাতালে পৌঁছে সে কাউন্টার থেকে কেবিন নম্বর জেনে দ্রুত দোতলার কেবিনে প্রবেশ করল। কেবিনের বিছানায় সিনথিয়াকে অক্ষত অবস্থায় বসে থাকতে দেখে মাহবুবের হাড়ের ভেতর যেন জান ফিরে এলো। সে দ্রুত গিয়ে বোনকে বুকে জড়িয়ে ধরল, "সিনথিয়া! তুই ঠিক আছিস তো মা? কোথায় লেগেছে তোর?"
সিনথিয়া মাহবুবের বুকে মুখ লুকিয়ে বলল, "আমি ভালো আছি ভাইয়া। শুধু পায়ে একটু ছিলে গেছে। আমাকে যে আপুটা বাঁচিয়েছে, সে যদি ঠিক সময়ে ধাক্কা না দিত, তবে আজ আমি আর বাঁচতাম না।"
মাহবুব স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর সে কেবিনের দায়িত্বে থাকা ডাক্তারের সাথে কথা বলল। ডাক্তার তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, "ভয়ের কিছু নেই। হালকা চোট লেগেছে, ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হয়েছে। আজকে বিকেলেই ওনাকে আপনারা বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন। তবে ওনাকে যে মেয়েটি হাসপাতালে এনেছে, সে সত্যিই খুব সাহসী আর দায়িত্বশীল।"
মাহবুব ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানিয়ে কেবিন থেকে বের হয়ে হাসপাতালের লম্বা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। তার মনের ভেতরের উদ্বেগ এখন অনেকটাই শান্ত। সে পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছল এবং ওপরের মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিল।
ঠিক তখনই, তার ঠিক পাশটিতে এসে দাঁড়াল এক বোরকা পরা অবয়ব। মেয়েটির সারা শরীর কালো বোরকায় ঢাকা, মুখটা নিকাবে আবৃত—শুধু চোখের দুটো মণি বাইরে বের হয়ে আছে। মেয়েটি একটু সময় নিয়ে, খুব নিচু এবং দ্বিধামাখা গলায় প্রশ্ন করল, "আমাকে চিনতে পারেননি?"
মাহবুব মেয়েটির দিকে একবার তাকাল। বোরকা আর নিকাব পরা থাকায় সে প্রথম দেখায় চিনতে পারল না। সে কিছুটা লজ্জিত হয়ে মাথা নেড়ে বলল, "দুঃখিত, ঠিক চিনতে পারলাম না। আপনিই কি আমার বোনকে বাঁচিয়েছেন?"
মেয়েটি আলতো করে তার ফর্সা হাত দিয়ে মুখের নিকাবটি নিচের দিকে নামিয়ে দিল।
নিকাব সরতেই মাহবুবের চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই অতি চেনা, মায়াবী আর নিখুঁত সুন্দর মুখ—যা সে কোনোদিন ভুলতে পারবে না। এ তো বাগানবাড়ির সেই রহস্যময়ী মেয়ে! যার চোখের জল সেদিন তাকে এক কালরাত্রির পাপ থেকে বাঁচিয়েছিল।
"আমি সেদিনের সেই মেয়ে... যাকে আপনি নিজের বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন এবং মায়ের অপারেশনের জন্য এক লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন।" মেয়েটির ঠোঁটের কোণে এবার এক চরম কৃতজ্ঞতা আর স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।
মাহবুব অবাক চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। তার নিজের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস, তার একমাত্র আদরের ছোট বোনকে এই মেয়েটিই আজ নিজের জীবন বাজি রেখে বাঁচিয়েছে! মাহবুবের বুকটা এক অদ্ভুত এক কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল। সে বলল, "তুমি! আমার বোনকে তুমি বাঁচিয়েছ?
ভাগ্য আমাদের এভাবে আবার মেলাবে আমি ভাবিনি। আমি তোমাকে কীভাবে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছি না।"
মেয়েটি মৃদু হেসে বলল, "ধন্যবাদ দিতে হবে না। সেদিন আপনি এক লক্ষ টাকা না দিলে আমার মা আজ বেঁচে থাকত না। আজ আপনার বোনকে বিপদে দেখে আমি আর স্থির থাকতে পারিনি। আমার মনে হচ্ছে, ঈশ্বর আমাকে সুযোগ দিয়েছেন আপনার ঋণের সামান্য হলেও শোধ করার। আমার মা এখন একদম ভালো আছেন, অপারেশন পুরোপুরি সাকসেসফুল হয়েছে। হয়তো কালই ওনাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিয়ে দেবে।"
মেয়েটির এই নিঃস্বার্থ মন, সততা আর সরলতা দেখে মাহবুব মনে মনে তার প্রতি এক তীব্র এবং গভীর কৌতূহল অনুভব করতে লাগল। সে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, তোমার নামটাই তো সেদিন জানা হয়নি। তোমার নাম কী?"
মেয়েটি মাথা নিচু করে লাজুক গলায় বলল, "আয়শা।"
"চমৎকার নাম," মাহবুব বলল। "তা আয়শা, তুমি না তখন একটা চাকরি খুঁজছিলে? কোনো কাজ পেয়েছ কি?"
আয়শা ম্লান মুখে মাথা নাড়ল, "না স্যার, এখনো কোনো কাজ পাইনি। এই বাজারে পড়াশোনা শেষ করেও একটা সাধারণ চাকরি পাওয়া খুব কঠিন হয়ে গেছে।"
মাহবুব আর এক মুহূর্তও ভাবল না। সে তার পকেট থেকে নিজের একটি পার্সোনাল এক্সক্লুসিভ বিজনেস কার্ড বের করে আয়শার নরম হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল। কার্ডটিতে সোনালী অক্ষরে রাজকীয়ভাবে খোদাই করে লেখা—'মাহবুব আহমেদ, ডিরেক্টর, আহমেদ গ্রুপ অফ行业 (Group of Industries)'।
মাহবুব আয়শার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল, "আগামী শনিবার ঠিক সকাল দশটায় এই কার্ডটি নিয়ে আমাদের প্রধান অফিসে এসো। সেখানে নতুন কর্মচারীদের ইন্টারভিউ নেওয়া হবে। তুমিও ইন্টারভিউ দিও, হয়তো তোমার একটা ভালো চাকরি হয়ে যেতে পারে।"
আয়শা কার্ডটির দিকে তাকিয়ে পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল। ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় এবং প্রভাবশালী কোম্পানি 'আহমেদ গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ'-এর মালিকের একমাত্র ছেলে স্বয়ং মাহবুব! অথচ সেদিন সে কত সাধারণ একটা গাড়ি নিয়ে ঘুরছিল এবং এত বড় লোক হওয়া সত্ত্বেও তার মনে বিন্দুমাত্র অহংকার নেই, এক রাতের দেহোপজীবীকে সে বোন বলে এক লক্ষ টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিল!
আয়শা কার্ডটি বুকে চেপে ধরে কৃতজ্ঞ চোখে মাহবুবের দিকে তাকিয়ে রইল, আর মাহবুবের মনে হতে লাগল—এই মেয়েটির সাথে তার জীবনের গল্পটা হয়তো এখানেই শেষ হওয়ার নয়।