08/02/2026
জামায়াতের ইলেকশন গেইমটা আসলে কী?
জামায়াত ইলেকশনকে কেন্দ্র করে প্রস্তুতি নিয়েছে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। জামায়াত কখনোই ৩০০ আসনকে কেন্দ্র করে তার গেইমপ্ল্যান সাজায়নি। বরাবরই জামায়াতের টার্গেট ছিলো ১৬০-১৭০। জামায়াতের রিসার্চ এবং এনালাইসিসে বিশাল একটা টিম কাজ করে। দেশী-বিদেশী যত রিসার্চার, এনালিস্ট, স্ট্রাটেজিস্ট আছে সবাইকে জামায়াত এক টেবিলে নিয়ে এসে কাজ করেছে গত এক বছর। ফলে, জামায়াতের যত ডিসিশন, ইলেকশন ক্যাম্পেইন স্ট্রাটেজি – সবই ডেটা ড্রিভেন এবং এই এনালাইসিস টিমের রেজাল্টের উপর ভিত্তি করে। শেষ খবর যতটুকু জানি, জামায়াত ১৪৫-১৫০টা আসনের ব্যাপারে কনফিডেন্ট। এইটা কিন্তু একদিনে হয়নি। প্রতি মাসেই জামায়াত মানুষের এঙ্গেজমেন্ট, মতামত এগুলো পর্যালোচনা করে তাদের স্ট্র্যাটেজি ঠিক করেছে। এক সময় হয়ত আসন সংখ্যা ৫০-৬০ এর ঘরে ছিলো। এরপর তারা দেখেছে, কোন এইজ গ্রুপ অথবা কোন ডেমোগ্রাফিকে তাদের ভোট কম। এরপর সেই এইজ গ্রুপ এবং ডেমোগ্রাফিকের মানুষকে তারা কীভাবে টানতে পারে সেই স্ট্র্যাটেজি নিয়েছে। এই জায়গায় জামায়াত খুব ডায়নামিক ছিলো গত এক বছর এবং এখনো তারা সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছে।
অন্যদিকে ৫ আগস্টের পরে বিএনপির ধারণা ছিলো তারা ভূমিধ্বস বিজয় পাবে। যেহেতু বড় একটি দল, আওয়ামীলীগ নেই। ফলে, বিএনপি ছাড়া আর কোনো অপশন দেশের মানুষের কাছে নেই। এইটা সত্য। কিন্তু, সেটা ৫ আগস্টের পর এক মাসের মত সত্য ছিলো। এরপর থেকে জনমত ভাগ হতে শুরু করেছে। বিএনপির সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো জনমতের সেই শিফটকে বুঝে তারা কোনো স্ট্রাটেজি নেয় নি। তারা সেই আগের মতই ওভার কনফিডেন্ট থেকেছে। বিএনপির হুঁশ ফিরেছে মাস দুয়েক আগে। মাস দুয়েক আগে থেকে তারা তাদের ক্যাম্পেইন শুরু করেছে – অনলাইন এবং অফলাইনে। কিন্তু, এইজ গ্রুপ ভিত্তিক এবং ডেমোগ্রাফি ভিত্তিক ক্যাম্পেইন ডিজাইন তারা করেনি। আর রেগুলার বেইসিসে জনমত যাচাই করে জনমত কোনদিকে শিফট হচ্ছে, সেটা কীভাবে ঠেকানো যায়, সেরকম রিসার্চ এবং এনালাইসিসও তারা করেনি। বিএনপির ছাত্রসংসদে পরাজয়ের সবচেয়ে বড় কারণ তাদের ভালো রিসার্চার এবং এনালিস্ট গ্রুপ না থাকা। কিন্তু, ওভার কনফিডেন্সের কারণে তারা ছাত্রসংসদে হারার পরও তাদের ভুল শোধরায়নি। তারা ভেবেছে শুধুমাত্র রেটরিকের উপর ভর করে তারা জিতে যাবে।
জামায়াতের আরেকটা মাস্টারস্ট্রোক হলো এত এত মার খেয়েও তারা পাল্টা মার দেয়নি। বাংলাদেশের মানুষ জালিমকে পছন্দ করে না, মজলুমের পক্ষে থাকে। বিএনপি গত দেড় বছরে নিজেদের জালিম ইমেজ এস্টাবলিশ করেছে ২৩০+ খুন, ৬০+ ধর্ষণ করে এবং সীমাহীন চাঁদাবাজি করে। ফলে, জামায়াতকে আলাদা করে কষ্ট করতে হয়নি কারা জালিম আর কারা মজলুম এই ন্যারেটিভ তৈরি করতে। বিএনপির স্ট্র্যাটেজিস্ট হলে আমি এইসব খুনী, ধর্ষক আর চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে সারাদেশে একশনে যেতে বলতাম। মানুষ জানে যে, এগুলো একদিনে দুইদিনে সমাধান হয় না, কিন্তু দল এই ব্যাপারে আন্তরিক কীনা এটা মানুষ গুরুত্ব দেয়। বিএনপিকে এই ব্যাপারে উদাসীন দেখা গেছে। এটার কারণ ওভার কনফিডেন্স। তারা ধরেই নিয়েছে তারা জিতবেই, তারা ধরে নিয়েছে বহুবছর ধরে তারা রাজনীতি করছে, তারা অনেকবার ক্ষমতায় এসেছে, বিপরীতে জামায়াত কখনোই সরকার ক্ষমতায় যায়নি, তাই এখানে তেমন কোনো প্রতিযোগিতাই হবে না। অথচ, ফরেন মিডিয়া আর ফরেন রিসার্চাররা বাংলাদেশে না থেকেই বুঝতে পারছে, জামায়াত এই ইলেকশনে ‘ডার্ক হর্স’। বিএনপি এই ইলেকশনে ফেইল করবে তাদের এই ওভার-কনফিডেন্সের কারণেই।
টেকেন ফর গ্র্যান্টেড মনে করার কারণে বিএনপি ইশতেহার বা পলিসিতেও সময় দেয়নি। আপনি দেখবেন, তাদের ইশতেহারে তারা ২০০১ এর অনেক কিছুই কপি-পেস্ট করেছে, যেনবা ২৫ বছরে দেশে কিছু বদলায়নি। আপনি দেখবেন, বিএনপি খুব জেনেরিক কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছে। যেগুলো বেশিরভাগই ভেইগ। এর কারণ, তাদের প্রস্তাবনা ডেটা-ড্রিভেন না, হোমওয়ার্ক কম। অন্যদিকে জামায়াত এক বছর ধরে ২০০+ হেভিওয়েট লোককে বসিয়ে রিসার্চ করিয়েছে। ইশতেহার টিমের যতজনের সাথে আমার আলাপ হয়েছে, আমি তাদেরকে যখনই জিজ্ঞেস করেছি এটা কেন দিলেন, তারা আমাকে ডেটা দিয়ে উত্তর দিয়েছে, জেনেরিক আলাপ খুবই কম। তাদের হোমওয়ার্ক তাদের কথাবার্তায় ফুটে ওঠে। অন্যদিকে বিএনপির ইশতেহার একেবারেই পুরনো ধাঁচের, ২০ বছর আগের মডেলে বানানো। ইশতেহারের বাইরেও তারেক রহমান বিভিন্ন জেলায় গিয়ে যেসব বলছেন, সেগুলো এবসলিউটলি এম্বারেসিং। এগুলো সবগুলোই হোমওয়ার্ক না করার প্রমাণ এবং বিএনপির ওভার কনফিডেন্সের নমুনা।
জামায়াত থেমে নাই। তাদের আগামী ৩ দিনে কোন ভোটারদের টানতে হবে সেটা নিয়েও তাদের হোমওয়ার্ক করা আছে। তারা সেটা করবে। আর বিএনপি এই ৩ দিনে আরো কিছু গালভরা কথা বলবে, তৃণমূলে প্রতিদিন কয়েকশো ব্লান্ডার করবে, আর শেষমেশ ইলেকশনে হেরে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর অভিযোগ দিবে। মিলিয়ে নিয়েন। কিন্তু, নিজেদের ওভার কনফিডেন্সের কারণে পূর্ণ প্রস্তুতিসম্পন্ন প্রতিপক্ষকে কীভাবে হারাতে হবে এই স্ট্র্যাটেজি তৈরি না করার কারণে আত্মসমালোচনা করবে না।
এটা আমাকে মনে করিয়ে দেয় Robert Green এর সেই বিখ্যাত উক্তি:
“In politics, being underestimated is an advantage, but being overconfident is a death sentence.”
Asif Muhammad