25/11/2025
মুল লেখা: ইঞ্জিনিয়ার সাহেব
আমার বিল্ডিং কত মাত্রার ভূমিকম্পে টিকবে? —
একটু সহজ করে ব্যাখ্যা করা যাক।
বিল্ডিং ডিজাইনের পর প্রায়ই একটি প্রশ্ন আমরা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়াররা শুনি—
“আমার বিল্ডিং কত মাত্রার ভূমিকম্পে টিকে থাকবে?”
প্রশ্নটি খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এর উত্তরটা রিখটার স্কেল দিয়ে দেওয়া যায় না। কারণ ভূমিকম্প ডিজাইনের বিজ্ঞানটা একটু ভিন্ন।
১. ভূমিকম্পের মাত্রা (Magnitude) কী মাপে?
ভূমিকম্প যখন ঘটে, তখন পৃথিবীর ভেতরে সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ বের হয়ে আসে।সেই উৎসস্থলের শক্তির পরিমাণ সাইসমোগ্রাফ দিয়ে মাপা হয়।
আজকাল সবচেয়ে ব্যবহৃত স্কেল হলো—
Moment Magnitude Scale (Mw)
১ থেকে ১০ এর মধ্যে — লগারিদমিক স্কেল।
অর্থাৎ: এক মাত্রা বাড়লে শক্তি প্রায় ৩১ গুণ বেড়ে যায়।
২ মাত্রা বাড়লে শক্তি ১০০০ গুণ বেড়ে যায়।
মিডিয়াতে আমরা যে ৫.৫, ৬.0, ৭.০ মাত্রার খবর দেখি — সেটাই এই Magnitude।
রিখটার স্কেল বৃদ্ধি মানে শক্তি কত বাড়ে — সহজ ব্যাখ্যা
রিখটার স্কেল ও লিনিয়ার নয়; এটি logarithmic scale। অর্থাৎ, মাত্রা ১ বা amplitude ১০ গুণ বৃদ্ধি পায়।
কিন্তু শুধুমাত্র amplitude নয়—released energy আরও বেশি হারে বৃদ্ধি পায়।
রিখটার স্কেল,এটি আগে বহুল ব্যবহৃত ছিল, কিন্তু বড় মাত্রার ভূমিকম্পে এটির সীমাবদ্ধতা আছে। তাই আধুনিক সিসমোলজিতে Moment Magnitude (Mw) বেশি ব্যবহৃত হয়।
কিন্তু Magnitude আমাদের বলে না, ঢাকায় বা আপনার বিল্ডিং কতটা কাপবে
২. মানুষ যেটা অনুভব করে, তা হলো Intensity (MMI Scale)
এর নাম Modified Mercalli Intensity (MMI) স্কেল — I থেকে XII পর্যন্ত।
উদাহরণ:
II: শুধু খুব সংবেদনশীল লোকজন অনুভব করে
V: সবাই টের পায়, জিনিসপত্র নড়ে
VII:
ভালো ডিজাইন/কনস্ট্রাকশনের ভবনে ক্ষতি দুর্বল ভবনে মাঝারি থেকে বেশি ক্ষতি
Intensity জায়গা অনুযায়ী ভিন্ন হয় — তাই এক শহরে MMI-VI, আরেক শহরে MMI-IV হতে পারে একই ভূমিকম্পে।
৩. কিন্তু ডিজাইন কি Magnitude বা Intensity দিয়ে হয়? — না।
স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়াররা ডিজাইনে ব্যবহার করেন—PGA (Peak Ground Acceleration)অর্থাৎ, ভূমিকম্পের সময় মাটি কত G-ফোর্সে নড়বে।
Magnitude = উৎসস্থলের শক্তি
Intensity = কতটা অনুভব হলো
PGA = মাটির আসল "ঝাঁকুনি"
ডিজাইন শুধুমাত্র PGA দ্বারা হয় — Magnitude দ্বারা
৪. PGA কোথা থেকে আসে?
একটি দেশের ভূমিকম্প ইতিহাস, সম্ভাব্য ফল্টলাইন, অতীত কম্পন, ভূগর্ভস্থ জিওলজি ইত্যাদির ডেটা বিশ্লেষণ করে Seismic Hazard Assessment করা হয়।
এর ফলাফল থেকে জাতীয় বিল্ডিং কোড নির্ধারণ করে:দেশের কোন অঞ্চলে কত PGA দিয়ে ডিজাইন করতে হবে কোন ধরনের বিল্ডিং কত লেভেলের সেফটি পাবে
BNBC 2020 অনুযায়ী ঢাকার Seismic Zone Coefficient Z = 0.20 (Zone 2) এই Z মান থেকে PGA নির্ধারিত হয়, এবং সেটাই ডিজাইনে ব্যবহার হয়।
৫. বিল্ডিং ডিজাইনে ভূমিকম্পের লোড কীভাবে কাজ করে?
সবচেয়ে সহজভাবে:
ভর × ত্বরণ = বল (F=ma)
একটি সমতুল্য ভূমিকম্প ত্বরণ (PGA) ধরে নিউটনীয় সূত্র থেকে বিল্ডিংয়ের উপর বল হিসাব করা হয়।
বীম
কলাম
শিয়ার ওয়াল
ফাউন্ডেশন—সবকিছুই সেই লোড সহ্য করতে পারে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়।
আরও উন্নত পদ্ধতি আছে:
Modal analysis
Response spectrum analysis
Time history analysis
তবে এগুলোর কোনোটাই “কত রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প” ভিত্তিক নয়।
৬. তাহলে আসল উত্তর কী?
একজন ইঞ্জিনিয়ার Magnitude দিয়ে নয়, বরং এইভাবে উত্তর দেবেন—
“আপনার বিল্ডিং BNBC 2020 অনুযায়ী এই এলাকার সর্বোচ্চ প্রত্যাশিত মাটির ত্বরণ (PGA/Z) সহ্য করতে ডিজাইন করা হয়েছে।”
আর্থকোয়াক যে লেভেলের শক্তিশালী ভূমিকম্পের জন্য ডিজাইন করতে বলে
আপনার বিল্ডিং সেই লেভেল পর্যন্ত সেফ
কিন্তু কোন নির্দিষ্ট মাত্রা (৬.৫, ৭.০, ৭.৫) বলে দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
কারণ—
একই ৭.০ মাত্রার ভূমিকম্পযদি সিলেটে হয় → ঢাকায় কম কম্পন
যদি ঢাকার কাছে হয় → ঢাকায় বেশি কম্পন
গভীর হলে → কম প্রভাব
অগভীর হলে → বেশি প্রভাব
মাটির ধরন পরিবর্তন করলে → আরও ভিন্ন প্রভাব
সংক্ষেপে:
বিল্ডিং “রিখটার স্কেল” দিয়ে ডিজাইন হয় না।
ডিজাইন হয় মাটির ঝাঁকুনি (PGA/Z value) দিয়ে।
Dhaka Zone-2 (Z = 0.20) অনুযায়ী বিল্ডিং কোডের সর্বোচ্চ সিসমিক লোড ধরে ডিজাইন করা হয়।
সঠিকভাবে ডিজাইনে করলে বড় ভূমিকম্পেও ভবন ধসে পড়বে না — এটাই কোডের লক্ষ্য (life safety)।
রেফারেন্স (USGS (United States Geological Survey)
“Each whole-number increase on the magnitude scale represents a tenfold increase in measured amplitude and about 31.6 times more energy release.”
Richter (1956), Gutenberg & Richter Relationship
IASPEI Seismological Reference Tables