29/04/2026
১৯৯৭ সালের সেই এক হাড়কাঁপানো শীতের সকাল। দিল্লির এক জীর্ণ গলি, যেখানে একটি পুরনো ভাড়াবাড়ি থেকে ৯৪ বছরের এক বৃদ্ধকে অত্যন্ত অপদস্থ করে বের করে দেওয়ার তোড়জোড় করছেন এক ক্ষুব্ধ বাড়িওয়ালা। বৃদ্ধের অপরাধ—তিনি গত দুই মাস ঘরভাড়া দিতে পারেননি। বৃদ্ধের সমস্ত সহায়-সম্বল বলতে ছিল একটা পুরনো ছেঁড়া চাদর, একটা পাটের মাদুর, প্লাস্টিকের একটি নীল রঙের বালতি আর একটা তুবড়ে যাওয়া অ্যালুমিনিয়ামের থালা। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এক তরুণ সাংবাদিক যখন এই দৃশ্যটি লক্ষ্য করলেন, তখন তিনি মনে করেছিলেন এটি হয়তো সমাজের আর পাঁচটা সাধারণ ঘটনার মতোই একটি করুণ দৃশ্য। তিনি পকেট থেকে ক্যামেরা বের করে বৃদ্ধের কয়েকটি ছবি তুললেন এবং বাড়িটির ছবি নিলেন। তিনি মনে মনে ঠিক করেছিলেন, খবরের কাগজের পাতায় একটি শিরোনাম দেবেন— "টাকার জন্য এক অসহায় বৃদ্ধকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন পাষাণ হৃদয়ের এক বাড়িওয়ালা!"
দপ্তরে গিয়ে সাংবাদিক যখন তাঁর সম্পাদককে ছবিগুলো দেখালেন, তখন সম্পাদকের চোখ চড়কগাছ হয়ে গেল। তিনি কাঁপা গলায় সাংবাদিককে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি জানো এই বৃদ্ধটি কে?" সাংবাদিক অবাক হয়ে মাথা নাড়লেন—না, তিনি জানতেন না। পরদিন যখন খবরের কাগজে বড় বড় হরফে প্রতিবেদনটি ছাপা হলো, তখন শুধু দিল্লি নয়, সারা ভারত স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। খবরটির শিরোনাম ছিল: "অসহায় অবস্থায় জীর্ণ কুটিরে দিন কাটাচ্ছেন ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শ্রী গুলজারিলাল নন্দ!" ল্যাবরেটরির মতো নিখুঁতভাবে যখন তথ্যগুলো সামনে আসতে লাগল, তখন মানুষ দেখল এক অবিশ্বাস্য বৈরাগ্য।
গুলজারিলাল নন্দ কেবল একজন সাধারণ রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তিনি ছিলেন এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করা এক প্রখর মেধাবী ব্যক্তিত্ব। ব্রিটিশ ভারতের বোম্বে সেন্ট্রাল কলেজে তিনি অর্থনীতির অধ্যাপনা করেছেন এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে সরাসরি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৬৪ সালে জওহরলাল নেহরুর আকস্মিক প্রয়াণ এবং ১৯৬৬ সালে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর, দেশ যখন ঘোর সংকটে, তখন এই মানুষটিই দুইবার ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অসামান্য দক্ষতার সাথে দেশের হাল ধরেছিলেন। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। অথচ এমন এক মানুষ শেষ বয়সে ঘরভাড়া জোগাড় করতে পারছিলেন না। কেন? কারণ তিনি রাজনীতিকে টাকা উপার্জনের ‘পেশা’ নয়, বরং মানুষের ‘সেবা’ করার এক পবিত্র ব্রত মনে করতেন।
ভারত সরকার যখন তাঁকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে মাসিক ৫০০ টাকা ভাতা দিতে চেয়েছিল, তিনি তা বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছি, সেই আত্মত্যাগ আমি সামান্য কয়েকটা টাকার বিনিময়ে বিক্রি করতে পারব না।" তাঁর কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স ছিল না, কোনো ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল না, এমনকি নিজের কোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই পর্যন্ত ছিল না। খবর যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি.ভি. নরসিমা রাওয়ের কাছে পৌঁছাল, তিনি সশরীরে মন্ত্রীদের বিশাল বহর নিয়ে সেই ভাঙাচোরা ভাড়াবাড়িতে হাজির হলেন। বাড়িওয়ালা তখন ভয়ে আর অনুশোচনায় কাঁপছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যাকে তিনি বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তিনি আসলে ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘ভারতরত্ন’ পেতে যাওয়া এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
গুলজারিলাল নন্দ ছিলেন নিরহংকার। তিনি বাড়িওয়ালাকে ক্ষমা করে দিয়ে বলেছিলেন, "উনার তো কোনো দোষ নেই, তিনি কেবল নিয়ম পালন করেছেন। আমার কাছে ভাড়া নেই, সেটা আমার ব্যর্থতা।" তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সরকারি কোনো বাংলো বা সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে রাজি হননি। তাঁর কাছে আবেদন করা হয়েছিল সরকারি আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু তিনি বলেছিলেন—"আর কটা দিনই বা বেঁচে আছি, এভাবেই না হয় জীবনটা কেটে যাক!" ১৯৯৭ সালের ১৫ই জানুয়ারি ৯৯ বছর বয়সে যখন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন তাঁর ঘরে পড়ে ছিল কেবল সেই ফাটা মগ আর ছেঁড়া চাদরটি।
আজকের ডিজিটাল যুগে, যেখানে সামান্য একজন পঞ্চায়েত সদস্য বা পৌরপ্রতিনিধি হওয়ার কয়েক বছরের মাথায় কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি গড়ে ফেলেন, সেখানে গুলজারিলাল নন্দের এই ত্যাগ এক বিশাল চপেটাঘাত। আধুনিক রাজনীতিতে যেখানে ‘কাটমানি’ আর ‘তোলাবাজি’ শব্দগুলো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে, সেখানে এই ‘অস্থায়ী’ প্রধানমন্ত্রী প্রমাণ করেছিলেন যে সততা কোনো পদের মুখাপেক্ষী নয়। তিনি তেরঙার সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবনকে নিঃস্ব করে দিয়েছিলেন, কিন্তু দেশবাসীর মনে তাঁর জন্য তৈরি হয়েছিল এক অজেয় ও অমর সিংহাসন। আজকের প্রজন্মের কাছে গুলজারিলাল নন্দ এক মহাকাব্যিক প্রেরণা, যিনি শিখিয়ে গেছেন যে—আসল ঐশ্বর্য পকেটে নয়, মানুষের চরিত্র আর আদর্শে থাকে। স্যালুট এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীকে।
SOURCES:
1/ Gulzarilal Nanda