16/10/2025
🚫 Attention 🔥
ইমার্জেন্সি লাইটের রক্তবর্ণ আলো-আঁধারিতে ঢেকে গেছে ফায়ার স্টেশনের করিডোর।
লিভিং কোয়ার্টার ছেড়ে যে করিডোর ধরে ঝড়ের গতিতে ছুটে যাচ্ছেন এক ঝাঁক তরুণ ফায়ারফাইটার,
ওদিকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে সমগ্র স্টেশনে বাজছে ইমার্জেন্সি অ্যালার্ম।
সাউন্ড সিস্টেম থেকে ভেসে আসছে যান্ত্রিক কণ্ঠে জরুরি নির্দেশ—
“Attention! High-rise structure fire! Dispatch fire engine one, four, nine! Fire truck two, fire truck four! Dispatch squad vehicle one, command vehicle one! Code two! Code two!”
অ্যাপারাটাস বে’র দরজা খুলে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই ৩৫ জন অগ্নিনির্বাপক যোদ্ধা নিজ নিজ গিয়ার লকারের সামনে উপস্থিত।
সাধারণ পোশাক ছেড়ে তারা স্পেশালাইজড গিয়ারে নিজেদের আপাদমস্তক সজ্জিত করে ফেললেন।
স্টেশনে ইমার্জেন্সি অ্যালার্ম চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সরে গেল শাও’য়ান ফায়ার স্টেশনের ভারী স্টিল ডোর।
সেখান দিয়ে ইমার্জেন্সি লাইট আর তীক্ষ্ণ সাইরেন বাজিয়ে বেইজিংয়ের রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল তিনটি ফায়ার ইঞ্জিন,
দুটি ফায়ার ট্রাক, একটি কমান্ড ভেহিকল এবং একটি ভারী রেসকিউ ভেহিকলের বিশাল বহর।
প্রচণ্ড গতিতে ছুটে চলা বহরের শেষে অবস্থান নেওয়া কমান্ড ভেহিকলে বসে নিজের ঘড়ি দেখলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত চাইনিজ ফায়ার কমান্ডার।
অ্যালার্ম চালু হওয়ার পর ৬০ সেকেন্ডের কাঁটা ছোঁয়ার আগে এখনো বাকি ১৫ সেকেন্ড।
ইমার্জেন্সি লেন ধরে ঝড়ের বেগে ছুটছে তার ফার্স্ট রেসপন্ডার ইউনিট।
Time on target: ২৫৫ সেকেন্ড।
প্রতিটি অতিক্রান্ত মুহূর্ত যেন নির্ধারণ করছে জীবন আর মৃত্যুর সীমারেখা।
অস্বস্তি কাটাতে গাড়ির সিকিউর কমিউনিকেশন সিস্টেমে হাত রাখলেন তিনি — কমান্ড সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে!
উপরে এতক্ষণ ধরে আমি যে দৃশ্যটি অঙ্কন করেছি, সেটি China Fire & Rescue-এর অধীনে চীনের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে ছড়িয়ে থাকা
রেসপন্স ইউনিটগুলোর বাস্তব দৃশ্য। বেইজিংয়ের শাও’য়ান স্টেশনকে সেখানে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিসেবে গণ্য করা হয়।
চীনা ফায়ার সার্ভিসের জন্য অ্যালার্ম বাজা থেকে ইঞ্জিন ডিসপ্যাচ পর্যন্ত মানসম্মত সময়সীমা মাত্র ৪৫ সেকেন্ড।
দেশের সেরা স্টেশনগুলো নিয়মিতভাবে এই সময়সীমা আরও কমিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
বেইজিং শহরে অ্যালার্মের পর সর্বোচ্চ Time on Target নির্ধারিত রয়েছে ০৫ মিনিট,
অর্থাৎ অগ্নিকাণ্ডের সংবাদ পৌঁছানোর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে যায়।
তবে চীনের অগ্নিনির্বাপণ তৎপরতা China Fire & Rescue-এর ইঞ্জিন রওনা হওয়ার অনেক আগেই শুরু হয়ে যায়।
এর সূচনা হয় তাদের জরুরি টেলিফোন নম্বর 119-এ কল পড়ার সঙ্গে সঙ্গে।
কোনো নাগরিক যখন 119-এ ফোন করেন,
তখন কমান্ড সেন্টারের সঙ্গে সংযুক্ত Artificial Intelligence System তাৎক্ষণিকভাবে তার ফোনের GPS Tracking শুরু করে।
একই সঙ্গে চলে Autonomous Audio Analysis —
যেখানে কলারের চারপাশের শব্দ, মানুষের কথাবার্তা বা কোনো বস্তু নড়াচড়ার আওয়াজ বিশ্লেষণ করা হয়।
কলটি ভুয়া নয় বলে নিশ্চিত হলে,
সেখানে পাওয়া সমস্ত তথ্য সরাসরি চলে যায় fire Command System-এ।
এরপর ফায়ার কমান্ড সিস্টেম তড়িৎগতিতে কলারের অবস্থানের কাছাকাছি ফায়ার স্টেশনগুলো চিহ্নিত করে।
শহরাঞ্চলে হলে মিউনিসিপ্যাল ট্রাফিক কমান্ড সেন্টারের ডেটাবেস থেকে ট্রাফিক ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা হয়—
কোন স্টেশন সবচেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারবে।
একই সঙ্গে কলারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কী ধরনের সরঞ্জাম দরকার হতে পারে, সেটাও নির্ণয় করে সিস্টেম।
সম্পূর্ণ Dispatch Package তখন নির্বাচিত স্টেশনের আঞ্চলিক সাব-কমান্ড সেন্টারের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়।
সাব-কমান্ড থেকে নিশ্চিতকরণ পাওয়া মাত্রই শুরু হয় ট্রান্সমিশন,
এবং সমগ্র স্টেশনে বেজে ওঠে তীক্ষ্ণ অ্যালার্ম।
ফায়ার ইঞ্জিনে থাকা মোবাইল ডাটা টার্মিনালের বড় ডিজিটাল ডিসপ্লেতে তখন দেখা যায় ডিসপ্যাচ অর্ডার—
টার্গেট লোকেশন, রুট ম্যাপ, GPS কো-অর্ডিনেট, নিকটবর্তী ফায়ার হাইড্রেন্ট, হ্যাজার্ড এবং অন্যান্য তথ্য।
৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই ফায়ারফাইটাররা সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে ভেহিকলে চড়ে বসে।
ইঞ্জিন লঞ্চ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেম তাদের ডিপারচার রেকর্ড করে নেয় এবং
সিটি ট্রাফিক ব্যুরোকে নির্দিষ্ট রুটের ইমার্জেন্সি লেন ফাঁকা রাখা ও ট্রাফিক সিগন্যাল সবুজ রাখার অনুরোধ জানায়।
কারণ, লাল বাতি থাকলে যানজট সৃষ্টি হতে পারে।
পরিষ্কার রাস্তা ধরে তখন শক্তিশালী রেসকিউ ইউনিট দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলে।
ফোনকল পড়ার মাত্র ৬ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে যায়।
২০২০ সাল থেকে চীন রাজধানী বেইজিংয়ে চালু করেছে
Smart Fire Protection নামের এক অত্যাধুনিক ব্যবস্থা।
যার ফলে আগুনের খবর 119-এ কেউ না পাঠালেও চলে—
কারণ, ফায়ার সেন্সর নিজেরাই আগুন, গ্যাস লিক, বৈদ্যুতিক বিপদ বা পানির চাপের পরিবর্তন শনাক্ত করে
স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমান্ড সেন্টারে সংকেত পাঠায়।
সিস্টেমের আরেক অংশ সার্বক্ষণিক বিভিন্ন ডাটা বিশ্লেষণ করে Predictive Analysis চালায়,
যেখানে আগুন লাগার আশঙ্কা রয়েছে, সেসব স্থাপনার বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তাও পাঠায়।
এছাড়া, বেইজিংয়ের জনবহুল ও বিপদজনক অঞ্চলগুলো—
বিশেষ করে যেখানে বয়স্ক বা পঙ্গু মানুষ বসবাস করেন—
সেখানে স্মোক সেন্সর বসানো থাকায় কেউ ফোন না করলেও
সিস্টেম নিজেই রেসপন্স আরম্ভ করে দেয়।
এতক্ষণ আমরা দেখলাম চীনে মানুষ, প্রযুক্তি ও পরিকল্পনার চমৎকার সমন্বয়।
এরপর বাংলাদেশের চিত্র আঁকলে তা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক।
শুধু সক্ষমতার বিচারে বেইজিং শহর একাই আমাদের পুরো দেশের ফায়ার সার্ভিসের চেয়ে অনেক এগিয়ে।
সাত বছর আগে বেইজিং সিটির ফায়ার ও রেসকিউ সার্ভিসের হাতে ছিল ৮৫৮টি অগ্নিনির্বাপক যান।
অন্যদিকে আমাদের দেশে বর্তমানে ফায়ার ইঞ্জিন, ল্যাডার ও অন্যান্য মিলিয়ে আনুমানিক ৭৭০টি যান রয়েছে।
এখানে মনে রাখতে হবে— আমরা একটি শহরের সঙ্গে পুরো দেশের তুলনা করছি।
শুধু Specialized Rescue নিয়ে কথা বললে দেখা যায়,
বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে ৬টি HAZMAT টিম রয়েছে বলে অনুমান করা যায়।
অপরদিকে, বেইজিংয়ের প্রতিটি আঞ্চলিক সাব-কমান্ডের অধীনে রয়েছে
মাল্টি-পারপাস রেসকিউ কোম্পানি ও স্পেশাল রেসকিউ টিম,
যাদের সক্ষমতার মধ্যে HAZMAT অন্যতম।
চীনের Ministry of Emergency Management (MEM)-এর অধীনে
China Fire & Rescue পরিচালনা করে ৩,৫০০টি Special Response Team,
যাদের বিশেষ সক্ষমতা নিম্নরূপঃ
০১| High-Rise Structure Rescue – সুউচ্চ ভবনে অগ্নিকাণ্ড বা জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার কার্যক্রম।
০২| Subterranean Rescue – ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আটকে পড়া মানুষ বা প্রাণী উদ্ধারে দক্ষতা।
০৩| Forest & Grassland Fire Management – বন ও চারণভূমিতে দাবানল মোকাবিলায় সক্ষমতা।
০৪| HAZMAT – রাসায়নিক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড ও রেসকিউ ব্যবস্থাপনা।
০৫| Large Commercial Complex Rescue – জনবহুল স্থাপনায় আগুন বা ধ্বসের পর উদ্ধার অভিযান।
০৬| Earthquake Response – ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমে বিশেষজ্ঞতা।
০৭| Flood Rescue – বন্যার সময় উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম।
০৮| Mountain & Arctic Rescue – পাহাড়ি বা বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলে রেসকিউ তৎপরতা।
এই দলগুলো তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেয়।
তাদের জন্য রয়েছে চীনের নিজস্ব বিশেষায়িত ট্রেনিং স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পড়াশোনার সুযোগও।
এছাড়া, তাদের National Fire & Rescue Administration (NRFA)-এর নিজস্ব Aviation Wing রয়েছে,
যারা হেলিকপ্টার ও কার্গো–ফায়ার ফাইটিং প্লেন পরিচালনা করে।
তাদের হাতে এমন বিমানও আছে, যা বিশাল অগ্নিকাণ্ডের সময় Airborne Command & Communication Center হিসেবে কাজ করে।
২০২২ সালের নভেম্বর নাগাদ এই হেলিকপ্টার ও বিমান বহর পরিচালনা করেছে প্রায় ২০,০০০টি ফ্লাইট।
সুতরাং, আমাদের অবস্থাটা কতটা নাজুক— তা আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই।
বাংলাদেশে দুর্যোগের সময় উদ্ধার না পেয়ে মানুষের জীবন হারানোর সম্ভাবনা আজও অনেক বেশি।
একটি দেশের Rescue Service ও Emergency Medical Team (EMT)
যুদ্ধ ও দুর্যোগের সময় কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গাজায় আমরা প্রায়ই দেখি, Israel Defense Forces ইচ্ছাকৃতভাবে EMT ও রেসকিউ টিমকে টার্গেট করে—
কারণ, তারা জনগণের শেষ আশা।
যুদ্ধের ময়দানে যখন সেনাবাহিনী লড়াই করে,
তখন পেছনে সাধারণ মানুষের সুরক্ষার দায়িত্ব নেয় এই রেসকিউ ইউনিটগুলো।
সাম্প্রতিক ভারত–পাকিস্তান সংঘর্ষের সময়ও আমরা দেখেছি,
সেদিন রাতে পাকিস্তানের স্ট্যান্ডবাই বাহিনীগুলোর মধ্যে Pakistan Fire Service ছিল অন্যতম—
ইমার্জেন্সি লাইট চালু রেখে সাধারণ নাগরিকদের সাহায্যে প্রস্তুত ছিল তারা।
বাংলাদেশেও যদি দাঙ্গা, যুদ্ধ বা দুর্যোগ আসে—
তাহলে তাদেরই প্রথম এগিয়ে আসতে হবে।
তাদের পঙ্গু করে রেখে লাভ কী?
আরেকটি কথা বলে শেষ করি—
চীনের China Fire & Rescue-এর এই সক্ষমতার পেছনে
শুধু তাদের সার্ভিসের পেশাদারিত্ব নয়,
বরং সরকারি কাঠামোর প্রতিটি স্তরের পেশাদারিত্ব
এবং তাদের নাগরিকদের দায়িত্ববোধও সমানভাবে কাজ করছে।
ধন্যবাদ।