11/05/2026
*মহান মে দিবস - শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও আত্মত্যাগের ইতিহাস*
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। সিংগাইর উপজেলা ইমারত নির্মান শ্রমিক ইউবিয়ন কর্তৃক আয়োজিত ১মে দিবসে উপস্থিত
শ্রদ্ধেয় সভাপতি, সম্মানিত অতিথিবৃন্দ ও আমার সংগ্রামী শ্রমিক ভাইয়েরা
আসসালামু আলাইকুম।
আজ ১ মে, মহান মে দিবস। আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস। আজকের এই দিনটি কোনো সাধারণ ছুটির দিন নয়। এটি পৃথিবীর কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের ঘাম, রক্ত আর জীবনের বিনিময়ে অর্জিত অধিকারের ইতিহাস।
*ইতিহাসের পটভূমি*
ঊনবিংশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লবের পর কলকারখানার মালিকরা শ্রমিকদের দিয়ে দিনে ১৪ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করাতো। কোনো সাপ্তাহিক ছুটি ছিল না, ছিল না চিকিৎসা বা নিরাপত্তার ব্যবস্থা। এই অমানবিক শোষণের বিরুদ্ধে ১৮৬৪ সালে কার্ল মার্কসের নেতৃত্বে গঠিত হয় 'International Workingmen's Association'। তারাই প্রথম দাবি তোলে: দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিনোদন আর ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম।
*শিকাগোর রক্তঝরা দিনগুলো*
আমেরিকায় ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সালের গৃহযুদ্ধে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলেও শ্রমিক শোষণ বন্ধ হয়নি। তাই ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরসহ সারা দেশে প্রায় ৩ লক্ষ শ্রমিক ধর্মঘটে নামে। শুধু শিকাগোতেই জড়ো হয় ৪০ হাজারের বেশি শ্রমিক।
৩ মে, ম্যাককর্মিক হারভেস্টার কারখানার সামনে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশ গুলি চালালে ২ জন শ্রমিক শহীদ হন। জার্মান বংশোদ্ভূত আমেরিকান অভিবাসী ও শ্রমিক নেতা অগাস্ট স্পাইস তখন সেখানেই বক্তৃতা দিচ্ছিলেন।
এই হত্যার প্রতিবাদে ৪ মে ১৮৮৬ সালে শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারে বিশাল সমাবেশ ডাকা হয়। সমাবেশ প্রায় শেষের দিকে, হঠাৎ বোমা বিস্ফোরণে ৭ জন পুলিশ নিহত হন। সাথে সাথে পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে ৪ জন শ্রমিক নিহত ও ৭০ জনের বেশি আহত হন। ইতিহাসে এটি 'হে মার্কেট ট্র্যাজেডি' নামে পরিচিত।
*ফাঁসির মঞ্চে অমর হয়ে থাকা কণ্ঠ*
এই ঘটনার বিচারের নামে প্রহসন করে ৮ জন শ্রমিক নেতাকে অভিযুক্ত করা হয়। প্রমাণ ছাড়াই অগাস্ট স্পাইস, অ্যাডলফ ফিশার, জর্জ এঙ্গেল ও অ্যালবার্ট পার্সনসকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
ফাসির মন্চ্ঞে দাঁড়িয়ে Ogust spaies সেদিন জোড়ালো গলায় সেই অমর বাণীটি উচ্চারণ করেন:
"You may strangle this voice, but there will be a time when our silence will be more powerful than the voices you strangle today."
"আজ তোমরা আমাদের কণ্ঠ রোধ করতে পারো, কিন্তু এমন এক সময় আসবে যখন আমাদের এই নীরবতা তোমাদের দমন করা কণ্ঠস্বরের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।"
মে দিবসের স্বীকৃতি
শ্রমিকদের সেই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে কে 'আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস' হিসেবে ঘোষণা করা হয়।। ১৮৯০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এই দিনটি পালিত হচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশে ১৯৭২ সাল থেকে ১ মে সরকারি ছুটি ও রাষ্ট্রীয়ভাবে শ্রমিক দিবস পালিত হয়ে আসছে।।
****"আজকের অঙ্গীকার"***
প্রিয় শ্রমিক ভাইয়েরা,
মে দিবস আমাদের শেখায়, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কাছে কোনো শোষক টিকতে পারে না। আজকের বাংলাদেশে গার্মেন্টস, নির্মাণ, কৃষি, পরিবহন খাতের প্রতিটি শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাই হোক আমাদের আজকের শপথ।
কার্ল মার্কস বলেছিলেন, "দুনিয়ার মজদুর এক হও"। আসুন, আমরা সেই ঐক্যের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে একটি শোষণমুক্ত, মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
সবাইকে মহান মে দিবসের রক্তিম শুভেচ্ছা।
জয় হোক মেহনতি মানুষের।